| শেখ কামরুল হোসেন ও মাহবুব আহমেদ |
আমার বাঁশখালী ডেক্স:
আসিফ আহমেদ: ফারমার্স ব্যাংকের তারল্য সংকটের নেপথ্যে উঠে এসেছে
ব্যাংকটির উচ্চ পদস্থ কিছু কর্মকর্তা ও শাখা ব্যবস্থাপকদের সীমাহীন অনিয়ম ও
দুনীর্তির বিষয়। এদের মধ্যে অন্যতম ব্যাংকটির মাওনা শাখা প্রধান শেখ
কামরুল হোসেন ও বসুন্ধরা শাখার জেষ্ঠ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আহমেদ।
অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে এই মর্মে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে
ব্যাংকটির ভুক্তভোগী গ্রাহক জোট। তথ্যবহুল সেই অভিযোগপত্রে দেখা যায়
ব্যাংকটির মাওনা শাখার প্রধান শেখ কামরুল হোসেন রীতিমত ক্ষমতার অপব্যবহার
করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গ্রাহক কে নিয়ম বর্হিভূত বিশাল অঙ্কের ঋণ পাইয়ে
দিয়েছে। পে অর্ডারের মাধ্যমে অন্যান্য বেশ কিছু গ্রাহকের পার্টি লিমিট
কমিয়ে দিয়ে সেই লিমিট নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করেছে। এমন কিছু
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সে দেখিয়েছে যেগুলোর প্রকৃত মালিক সে নিজেই,
এমনটাই উঠে এসছে ঐ অভিযোগ পত্রে। তাতে আরও উল্লেখ আছে, শুধুমাত্র
পেঅর্ডারের মাধ্যমেই কামরুল ৫ কোটি ১৭ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা আতœসাৎ করেছে।
মাওনা শাখার প্রায় ৪১ কোটি টাকা সে বিভিন্ন সময় একাধিক গ্রাহকের মাঝে ঋণ
আকারে দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কোন প্রকার অনুমোদন ছাড়াই। যার জন্য
একাধিকবার তাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছে। ব্যাংক
কর্তৃপক্ষকে উপেক্ষা করে সে তার এধরনের অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম অব্যাহত
রাখে। ফলে ব্যাংকের ঋণখেলাপী সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সূত্রেই এখন
কামরুলের দ্বারা সংঘটিত জানা অজানা সকল লেনদেন নিয়েও চলছে তদন্ত। কোটি কোটি
টাকার হিসাব গরমিলকারী কামরুল যাদের ঋণ প্রদান করেছেন তাদের তালিকা
বিশ্লেষন করে অভিযোগ পত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকটির ঐ শাখায়
সর্বমোট ১৭১টি অ্যাকাউন্টে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার ওভারডিউ রয়েছে, নতুন
করে আবার নিষ্পত্তি হয়েছে আরোও ৭০ টি একাউন্ট, যার পরিমান প্রায় ২৫ কোটি
টাকা যেটি ঐ শাখার এক্সেস ওভার লিমিট তথা শাখাটির ঋণ প্রদানের সীমারেখার
সম্পূর্ণ বাইরে। বিভিন্ন সময়ে মর্টগেজ পাশ হওয়ার পূর্বেই সম্পূর্ণ অনৈতিক ও
নিয়মবহির্ভূত ভাবে তড়িঘড়ি করেই চিহ্নিত কিছু গ্রাহকের ঋণ সন্দেহজনক ভাবেই
পাশ করিয়ে দিয়েছে কামরুল। প্লাবন এগ্রো, নাজমুল আলম ব্রিকস, এন এন এগ্রো
ট্রেড, নিউ ফ্যামিলি নিডস, রানা অটো ব্রিকস, ইমতিয়াজ আহমেদ শাসুল হুদা,
সেলিম অটো ব্রিকস লিঃ, দরবার কেমিকেল কোঃ, ইসলাম ব্রাদার্স, মা
এন্টারপ্রাইজ ব্রিকস প্রাঃ লিঃ, মিল ট্রেডিং কর্পোরশেন, ডলফিন ট্রেড
ইন্টাঃ, শানিমুন ইলেকট্রনিক্স, গোমতী ঔষধালয়, তৃণমূল মৎস খামার, সরকার
কর্পোরেশন, ভান্ডারি পোল্ট্রি ফার্ম, মীরা মৎস খামার, সামিয়া মৎস এন্ড
ডেইরি ফার্ম, ফ্রেন্ডস অটো’জ লিঃ প্রভৃতি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তন্মধ্যে
উল্লেখযোগ্য। এধরনের অনিয়মের ফলে ব্যাংকটির ঋণখেলাপী গ্রাহকের তালিকা বড়
হতে থাকে। নথি পত্রে দেখা যায় তালিকা ভুক্ত ২০ টি অ্যাকাউন্টের
প্রত্যেকটিতে ক্রেডিট লিমিটের তুলনায় অনিষ্পত্তি হওয়া অথচ প্রদানকৃত ঋণের
টাকার পার্থক্য কম করেও ২৫ লক্ষ!! অর্থাৎ প্রতিবারই পাশকৃত ঋণের তুলনায়
ঋণখেলাপী গ্রাহককে ব্যাংকটির মাওনা শাখা হতে প্রদত্ত ঋণের পরিমান অতিরিক্ত।
এধরনের নিয়মনীতি বর্হিভূত ঋণ লেনদেনে অসন্তোষ প্রকাশ করে ব্যাংকটির
কর্তৃপক্ষ মাওনা শাখায় পরবর্তিতে নোটিশ প্রদান করেছে কয়েকবার। অপর একটি
অভিযোগ পত্রে ব্যাংকটির বসুন্ধরা শাখার জেষ্ঠ্য নির্বাহি কর্মকর্তা মাহবুব
আহমেদ-ও একই ধরনের অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রমে জড়িত বলে অভিযোগ আছে। তাতে
উল্লেখ আছে, মাওনা শাখার কামরুল ‘গোমতী ঔষাধালয়’ নামক একটি অখ্যাত
প্রতিষ্ঠান কে নিয়মবর্হিভূত যে ঋণ প্রদান করেছে তা বসুন্ধরা শাখার জেষ্ঠ্য
নির্বাহি কর্মকর্তা মাহবুব আহমেদের যোগসাজশেই। ব্যাংকটিতে মাসিক বেতন ৬৪
হাজার ৫ শত টাকা সাপেক্ষে চাকরি করা এই মাহবুব আহমেদ ব্যাক্তিগত ভাবে ৩টি
বিলাশবহুল গাড়ির মালিক এবং ‘নকশি’ নামক একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের উদ্যোক্তা;
যেটির ধানমন্ডি, মিরপুর, পুলিশ মার্কেট, গুলশান সহ রাজধানীতে বেশ কয়েকটি
শাখা রয়েছে বলে জানা গেছে। গ্রাহকদের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, এত বড়
বিনিয়োগ মাহবুব আদৌ বৈধভাবে করেছে কিনা। ‘মেসার্স গোমতী ঔষধালয়’ নামক একটি
অখ্যাত প্রতিষ্ঠান ১৭ কোটি টাকা ঋণ পাইয়ে দেয় মাহবুব। এমন অখ্যাত একটি
প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূত এত বড় পরিমানের ঋণ প্রদানের কারণে গত বছরের
নভেম্বরে মাহবুবকে ফারমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান
করে। জানা যায় যে কমিশন স্বাপেক্ষে ও উপরের মহলের অগোচরেই এধরনের
নিয়মবর্হিভূত ঋণ প্রদান করার সুপারিশকারি হলো মাহবুব। উল্লেখ্য, তফসিলি এই
ব্যাংকটির তারল্য সংকট নিয়ে সাম্প্রতিককালে কম জলঘোলা হয়নি। কতিপয়
ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার উত্থানও হয়েছে গণমাধ্যমে। ঢালাওভাবে পরিবর্তন এসেছে
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদেও। মূলত আমানতকারীদের মধ্যে কিছু সংখ্যক গ্রাহক
তাদের আমানতের টাকা তুলে নেওয়ার পরপরই এ সংকটের সূচনা হয়। ব্যাংকটির কতিপয়
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কলঙ্ক লেপনের অপচেষ্টা করা হয় ব্যাংকটির
প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক পরিচালক-চেয়ারম্যান মহীউদ্দিন খান আলমগীর এর ললাটে।
বংশীয়, উচ্চশিক্ষিত ও বর্ষিয়ান এই জন প্রতিনিধি দেশের একজন সাবেক
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে পরীক্ষিত এই ব্যাক্তিত্ব দেশীয় ও
আন্তজার্তিক পর্যায়ের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা-প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ
পদ সমূহে সফল তা প্রায় সকলেরই জানা। গত সোমবার তিনি জাতীয় সংসদের পয়েন্ট অব
অর্ডারে দাড়িয়ে মাননীয় স্পীকারের নিকট তাঁর নিজ সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়ান
পার্লামেন্টে গমন বিষয়ক বিবৃতি প্রদান ও অনুমোদন গ্রহনকালে গণমাধ্যমে তার
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যাচারের তীব্র প্রতিবাদমূলক প্রতিক্রিয়া
উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, দেশের শীর্ষ সারির ৩টি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে
সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যাচার করা হয়েছে। সে সময়ে
তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিপরীতে তিনি ফারমার্স ব্যাংকে থাকা তাঁর
নিজ এ্যাকাউন্টের ব্যাংক স্ট্যাটমেন্ট প্রদর্শনপূর্বক উল্লেখ করেন,
স্ট্যাটমেন্টে স্পষ্ট যে ফারমার্স ব্যাংকের কোন ঋণ গ্রহীতার এ্যাকাউন্ট
থেকে তার এ্যাকাউন্টে কোন প্রকার লেনদেন সংঘটিত হয় নাই। উল্লেখ্য যে,
ব্যাংকটির চলমান সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মতান্ত্রিক যে
কার্যক্রম, তা সফলভাবে সম্পন্ন হতে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গত বছরের ২৭ নভেম্বর
তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাড়ান। একই সাথে ইস্তফা দেন
ব্যাংকটির সাবেক অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী। অথচ সেই
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে কতিপয় অসাধু-অতি উৎসাহি
ব্যাক্তিবর্গ বানোয়াট কিছু তথ্য উপাত্ত দিয়ে ব্যাংকটির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন
করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও ফারমার্স
ব্যাংকের সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনানুগ কার্যক্রম এখনও চলমান।
এমতাবস্থায় ব্যাংকটি সম্পর্কে যেকোন প্রকার মিথ্যাচার এই কার্যক্রমের জন্য
বাধা স্বরূপ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন
বিষয়টিতে অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছে। সূত্র: দৈনিক তৃতীয় মাত্রা




No comments:
Post a Comment