
নারীর জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় হল গর্ভাবস্থা। শুধু নারী নয়, তার শিশুর জীবন কিভাবে গড়ে উঠবে তা অনেকটাই নির্ভর করে এ সময়ের ওপরে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, যে সময়টাতে নিবিড় পরিচর্যা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশের মাঝে থাকা উচিত গর্ভবতী মায়ের, সে সময়টাতেই খুব ভুল কিছু ধারণার কারণে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষিত পরিবারগুলোতেও দেখা যায় বিভিন্ন ধরণের কুসংস্কারের প্রচলন। নানান ধরণের কুসংস্কার খুব প্রাচীন এবং অকেজো কিছু ধারণা এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন কিছু মানুষ। এগুলো হতে পারে ধর্মীয়, হতে পারে পারিবারিক কোনও প্রথা। পরিবারের প্রবীণ মানুষের কাছে এসব প্রথার মূল্য অনেক বেশি। তাদের মাথার ভেতরে এসব প্রথা এমনভাবে গেঁড়ে বসে আছে যে, গর্ভবতী মা এবং অনাগত শিশুর ক্ষতি হতে পারে জেনেও তারা এগুলো মেনে চলার ওপরে জোর দেন। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায় মা এবং শিশু উভয়েরই। এমনকি মৃত্যুও হতে দেখা যায় অনেক সময়ে। অন্য কিছু কুসংস্কার আছে যেগুলো তেমন ক্ষতিকর না হলেও নিতান্তই হাস্যকর। আসুন দেখে নেই এমন কয়েকটি কুসংস্কার।
১) খাদ্যভ্যাসঃ গর্ভবতী মা কি খেতে পারবেন আর কি খেতে পারবেন না তা নিয়ে রয়েছে প্রচুর কুসংস্কার। খাসির মাংস খেলে বাচ্চার শরীরে লোম বেশি হবে, সামুদ্রিক মাছ খেলে ক্ষতি হবে, জোড়া কলা খেলে যমজ বাচ্চা হবে, বেশি খাবার খেলে বাচ্চা বড় হয়ে জন্মদানের সময়ে ক্ষতি হবে ইত্যাদি। আসুন দেখি ঠিক কি কারণে এই সবগুলো কুসংস্কার ক্ষতি করছে গর্ভবতী মায়ের।
- – খাসির মাংস (বা অন্য যে কোনও খাবার) খাওয়ার সাথে বাচ্চার শরীরে লোম বেশি হবার সম্পর্ক নেই। বাচ্চার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় তার পিতামাতার জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। খাসির মাংস আমিষের বেশ ভালো উৎস। অনেকের গরুর মাংসে অ্যালারজি থাকে, তারা খাসির মাংস খান। কিন্তু সেটাও যদি খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় তাহলে মা এবং শিশু উভয়েই প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন।
- – সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রেও একি কথা বলা যায়। উপরন্তু এতে থাকে খুব উপকারি ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা বাচ্চার মস্তিষ্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।
- – জোড়া কলা খেলে যমজ বাচ্চা হবে- এটা নিতান্তই হাস্যকর কথা এবং কোনও যুক্তি নেই এর পেছনে। বাচ্চা যমজ হবে কি হবে না এটা আগে থেকে বলা খুবই কঠিন।
- – গর্ভবতী মায়ের কিছু অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া অত্যান্ত প্রয়োজনীয়। নইলে বাচ্চা এবং মা উভয়েই পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং জন্মদানের সময় বিভিন্ন রকমের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
গর্ভাবস্থায় পুষ্টি খুব জরুরি। মায়ের যা খেতে রুচি হয় তা-ই খেতে দিন। কোনও রকমের কার্পণ্য করবেন না। কোনও খাবার খেতে যদি ডাক্তার মানা করে দেয় তাহলেই শুধু সে খাবার বাদ দেওয়া যাবে।
২) নজরঃ অনেক পুরনো একটা ধারণা রয়েছে বাঙ্গালীদের মাঝে, যে অন্য মানুষের “নজর” লেগে বাচ্চা এবং মা উভয়ের ক্ষতি হবে। কিন্তু এই ব্যাপারটা পুরোটাই কুসংস্কার। মানুষের “নজর” বা দৃষ্টি অন্যের শারীরিক অবস্থাকে প্রভাবিত করবে কি করে? নারীকে বলা হয়- সে যে গর্ভবতী এই ব্যাপারটা যেন গোপন রাখা হয়। কারন অন্যেরা জানতে পারলে তাদের ঈর্ষা এবং মন্দ অভিপ্রায়ের “নজর” লাগবে এবং বাচ্চার ক্ষতি হবে। সন্তান জন্মদানের ব্যাপারটা এত খুশির ব্যাপার, অথচ তাকে গোপন করে রাখতে হবে চিন্তা করে মায়ের মন এমনিতেই খারাপ হয়ে যায়। তাকে বলা হয় যতদিন সম্ভব নিজের শরীরের অবস্থা ঢেকে রাখতে। এমনকি “নজর” যাতে না লাগে এর জন্য অনেক সময় তাকে বাসা থেকে বের হতেই দেওয়া হয় না। বলাই বাহুল্য এভাবে রাখ-ঢাক করলে বাচ্চার কোনও উপকার তো হয়ই না বরং মায়ের মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
৩) চাঁদ-সূর্যের অবস্থানঃ চন্দ্র-গ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, ঠিক দুপুরবেলা, সন্ধ্যাবেলা, মাঝরাত এসব সময়ে বাইরে বের হওয়া যাবে না- এমন একটা প্রথা তো আপনারা জানেন, তাই না? এর কতটুকু ভিত্তি আছে বলে আপনাদের মনে হয়? উত্তর- একটুও না। গ্রহণের সময়ে কাজ করা যাবে না, খাওয়া যাবে না- এমন প্রথা একেবারেই ঠিক নয়। সূর্যগ্রহণ যদি কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং এমন অবস্থায় যদি গর্ভবতী নারীর ক্ষুধা পায় তখন কি করবেন? এমন হাস্যকর একটা প্রথার জন্য তাকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাখা হবে রীতিমত অন্যায়। আর জরুরি প্রয়োজনে দিনের যে কোনও সময়ে তাকে বাইরে যেতে হতে পারে। প্রথার দোহাই দিয়ে তাকে আটকানোটাও একেবারেই অনুচিত।
৪) বাচ্চার লিঙ্গঃ বাচ্চা মেয়ে হবে না ছেলে হবে, এটা ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়া বলতে পারা যায় না। অথচ আমাদের দেশে কিছু প্রচলিত ধারণা আছে- বাচ্চা ছেলে হলে মায়ের চেহারা খারাপ হয়ে যাবে। বাচ্চা মেয়ে হলে চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যাবে। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো মিলে যেতে দেখা গেলেও ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলে দেওয়া ঠিক না। আর আরেকটি খুব প্রচলিত এবং ক্ষতিকর কুসংস্কার আছে। তা হলো- বাচ্চা ছেলে হবে না মেয়ে হবে তার পুরো দায় মায়ের। একেবারেই ভুল কথা। বাচ্চার লিঙ্গ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে বাবার ওপরে। বাবার শরীর থেকে আসা শুক্রাণুর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় বাচ্চা ছেলে হবে না মেয়ে হবে। আমাদের দেশে মেয়ে সন্তান জন্মালে এখনও মা’কে দোষারোপ করা হয়। আমরা বুঝতে চাই না যে মেয়ে সন্তান জন্ম নেওয়াটা একটা আশীর্বাদ। আমরা এটাও বুঝতে চাই না যে বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারণে মায়ের কোনও হাত নেই।
৫) ব্যায়ামঃ গর্ভাবস্থায় শরীর সুস্থ রাখতে হালকা ব্যায়াম জরুরি। এতে শিশুর শরীরও ভালো থাকে। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম করা যেতে পারে। এর মাঝে রয়েছে যোগব্যায়াম, সাঁতার ইত্যাদি। কিন্তু অনেক পরিবার আছে যেখানে গর্ভবতী মায়ের ব্যায়ামের কথা শুনলেই তারা ক্ষতির আশঙ্কা করে ব্যাপারটা নাকচ করে দেন। অথচ শরীর যথেষ্ট সক্রিয় না রাখলে যে মা এবং শিশু উভয়েরই ক্ষতি তা তারা বুঝতে চান না। এসব কুসংস্কার ছাড়াও আরও কিছু ভুল ধারণা আছে। যেমন মায়ের কোনও সমস্যা হলে তাকে তাবিজ-কবচ পরানো, ঝাড়-ফুঁক করা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মা এবং শিশুর ক্ষতি হয় এমন কোনও কিছুই করা যাবে না। কোনও রকমের আশঙ্কা দেখা দিলেই ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। পুরনো ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে না থেকে সত্যটা চিনুন। পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষতি করা বন্ধ করুন। আমার বাঁশখালী.কম। সূত্র: কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি।




No comments:
Post a Comment